April 6, 2026

নিজস্ব পেট্রল উৎপাদন সত্ত্বেও কেন এই জ্বালানি সংকট?

বাংলাদেশে পেট্রল ও অকটেনের মতো জ্বালানি পণ্যের একটি বড় অংশ দেশীয় গ্যাস ফিল্ডের উপজাত (কনডেনসেট) থেকে উৎপাদিত হয়। প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় যে উপজাত পাওয়া যায়, তা রিফাইন করে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হয়। তবুও জনমনে প্রশ্ন জাগে—যদি উৎপাদন দেশেই হয়, তবে মাঝে মাঝে কেন তেলের পাম্পগুলোতে সংকট দেখা দেয় বা দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়? এই সমস্যার মূলে রয়েছে রিফাইনিং সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, আমদানিনির্ভর অপরিশোধিত তেল এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জটিল সমীকরণ।

জ্বালানি সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশের রিফাইনারিগুলোর সীমিত ক্ষমতা। বাংলাদেশে একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’ বহু পুরনো এবং এর উৎপাদন ক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। দেশীয় কনডেনসেট থেকে যে পরিমাণ পেট্রল পাওয়া যায়, তা দিয়ে মোট চাহিদার একটি অংশ পূরণ হলেও অকটেন বা ডিজেলের জন্য আমাদের মূলত বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। যখন বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যায় অথবা ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যায়, তখন আমদানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আমদানিকৃত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশীয় উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত বাজারে ঘাটতি তৈরি করে।

দ্বিতীয়ত, দেশের পরিবহন ও বিতরণ ব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনাও এই সংকটের জন্য দায়ী। অনেক সময় দেখা যায়, জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও লজিস্টিক সমস্যার কারণে সময়মতো তেল পাম্পগুলোতে পৌঁছাতে পারে না। এর সাথে যুক্ত হয় অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আভাস পেলেই অনেক সময় সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে মজুদদারি করা হয়, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রক্রিয়ায় অনেক সময় নীতিগত জটিলতা তৈরি হয়, যার ফলে সরবরাহে সাময়িক স্থবিরতা দেখা দেয়।

পরিশেষে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কেবল দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। আমাদের রিফাইনিং সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং নতুন রিফাইনারি স্থাপনে বিনিয়োগ করতে হবে। একই সাথে ডলার সংকটের সমাধান এবং আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা জরুরি। তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করার মাধ্যমে যদি কৃত্রিম সংকট রোধ করা যায়, তবেই নিজস্ব উৎপাদন থেকে সাধারণ মানুষ প্রকৃত সুফল পাবে। স্থায়ী সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *