August 22, 2026

যেভাবে রাষ্ট্রপতির শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল, অতিথি ছিলেন যারা

ঢাকায় বঙ্গভবনের দরবার হলে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক এই পদের শপথ পাঠ করিয়েছেন জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল।

বঙ্গভবনে এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক, সংসদ সদস্য এবং বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও অনুষ্ঠানের অতিথির সারিতে ছিলেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির সঞ্চালনায় সন্ধ্যা ঠিক সাড়ে সাতটায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে এই শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। এর পরই পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত করা হয়। এরপর রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল।

শপথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করিতেছি যে আমি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব। আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব। আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।’

শপথের পর মির্জা ফখরুল শপথনামায় স্বাক্ষর করেন এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার তা সত্যায়ন করেন। শপথ গ্রহণের পর উপস্থিত সবাইকে সালাম জানান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শপথ গ্রহণের পর রাষ্ট্রপতিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে আসা হাফিজ উদ্দিন আহমদ। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে করমর্দন করেন বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি। এসময় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। একাধিক প্রার্থী থাকায় ৩৫ বছর পর এবার রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান সংসদের ৩৪৯ জন সদস্যের মধ্যে ৩৪৩ জন এই নির্বাচনে ভোট দেন। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। বিপুল ব্যবধানে নির্বাচিত হওয়ার পরদিনই রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন বিজয়ী প্রার্থী মির্জা ফখরুল।

দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত হওয়ার আগে ৭৮ বছর বয়সী রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ ছাড়া ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তার আগে পাঁচ বছর ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। মির্জা ফখরুলই বিএনপির সবচেয়ে দীর্ঘকালীন মহাসচিব। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাঁর নেতৃত্ব বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছিল।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার কালীবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বামপন্থী ছাত্রসংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (ইপিএসইউ) সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। পরে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন তিনি। একই সময়ে সরকারি চাকরির অংশ হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

মূলধারার রাজনীতিতে যোগ দিতে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। এর দুই বছর পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিজের জন্মস্থান উত্তরাঞ্চলের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে পৌর চেয়ারম্যান (বর্তমানে মেয়র পদ) নির্বাচিত হন তিনি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। প্রথমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন। দীর্ঘদিন দলের অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতি ও পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

২০০১ সালের নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বগুড়ার একটি আসন থেকে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে মির্জা ফখরুল তখন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *