অপ্রতিম হ*ত্যার পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে আটক ৬২৪, মুচলেকায় মুক্ত ৪৫১
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে এক রাতে ৬২৪ জনকে আটক করার পর ৪৫১ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় তাদের ছাড়া হয়। বাকি ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ থাকায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গত বুধবার রাতে পুলিশ এই অভিযান চালায়।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাং সদস্যদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় আসার পর এ অভিযান চালাল পুলিশ। এদিকে অপ্রতিম হত্যায় জড়িতদের দুজন ‘কেবিজি’ নামে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে। কেবিজির পুরো নাম–‘কোটবাড়ি বাইকার গ্রুপ’। পুলিশ বলছে, অপ্রতিম হত্যার মূল হোতা ১৯ বছরের সাইফুল ইসলাম তুহিন এই গ্রুপের সদস্য। অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার এক কিশোরের (১৫) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তুহিনের।
পুলিশ জানায়, সম্প্রতি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উঠতি বয়সের ছেলেদের সম্পৃক্ততা বেড়ে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলার ১৮টি থানা এলাকায় একযোগে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। এ সময় ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। অভিযান শুরুর পর বুধবার রাতেই সংশ্লিষ্ট থানার সামনে অভিভাবকরা ভিড় করতে থাকেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত তাদের অনেককে থানার বাইরে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
দাউদকান্দি মডেল থানা ও গৌরীপুর পুলিশ অভিযানে ৫৯ জনকে আটকের খবরে বুধবার রাত ৮টার দিকে শতাধিক অভিভাবক থানার সামনে উত্তেজনা সৃষ্টি করেন। এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া ভুয়া স্লোগান’ দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতির মধ্যে দাউদকান্দি থানার একটি কক্ষে থাকা অন্তত ১৫ কিশোর দরজা ভেঙে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার একটি ভিডিও ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
তবে থানায় ভাঙচুরের ঘটনা অস্বীকার করেছেন ওসি মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান পলাশ। তিনি বলেন, ‘থানায় বড় কোনো ভাঙচুর হয়নি। স্লোগান থানায় নয়, হয়তো বাইরে দেওয়া হয়েছে। একটি দরজার কিছু অংশ ভেঙে ফেলা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে আটক ৫৯ জনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
কোতোয়ালি মডেল থানার সামনে গতকাল দুপুরে দেখা যায়, ছেলের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সনদ ও কলেজের কাগজপত্র নিয়ে থানার সামনে বসে আছেন এক নারী অভিভাবক। তিনি বলেন, ‘পুলিশ বলছে, আমার ছেলে যে শিক্ষার্থী, তা প্রমাণ করতে পারলে ছেড়ে দেবে।’
ওই অভিভাবকের ভাষ্য, ‘আমার ছেলে রাত ৯টার দিকে এলাকার ছেলেদের সঙ্গে বসে আড্ডা দেয়। তাকে ধরে সঠিক কাজই করেছে পুলিশ। শিক্ষার্থীরা রাতে রাস্তায় আড্ডা দেবে কেন?’
অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া এক স্কুলছাত্রের জন্য তার খালা থানার সামনে অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আটকাইয়া না রাইখ্যা কয়ডা মাইর দিয়া ছাইড়া দিলে হয়। অহন মা, ভাই, খালা– সবাই তার জন্য থানায় আইতে হইসে। এটা শরমের বিষয়।’
কয়েকজন ক্ষুব্ধ অভিভাবক বলেন, অপ্রতিম হত্যার পর পুলিশের এমন অভিযানে তারা খুশি। তবে নির্দোষ কেউ যেন শাস্তি না পায়।
কোতোয়ালি থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, এ থানায় মোট ৭৫ জনকে আটক করা হয়। ছাত্রের বাইরে থাকা বিভিন্ন অভিযোগে ৫২ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্য ২৩ জনই শিক্ষার্থী। তাদের অধিকাংশই মা-বাবার কথা শোনে না। তাদের মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় ছাড়া হয়েছে।
গতকাল সন্ধ্যায় জেলা পুলিশের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা ও কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান বলেন, মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, মোবাইল কোর্ট, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানামূলে আটক ১৭৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিল্লা দক্ষিণ সদর থানা ও আশপাশ এলাকায় যেসব গ্রুপ সক্রিয় তার মধ্যে আছে কেএনএফ, ইসলামাইল, ‘র’, সিবিকে। প্রায় ছয় বছর ধরে আরও যেসব গ্রুপ সক্রিয় তার মধ্যে আছে– মডার্ন, রকস্টার, রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক ঈগল, আরজিএস, র্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিএমসি ও ডিস্কো বয়েজ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দক্ষিণ সদর এলাকায় সক্রিয় কেবিজি গ্রুপের দলনেতা হলেন আলী সাইমন। তার দলে আছেন সোহাগ রানা, হানজালাসহ কয়েকজন। সাইমনের এক মামা এই গ্রুপকে সহায়তা দেন। ওই মামার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, গত ২৮ আগস্ট আমির হোসেনের খামারে ফটক ভাঙচুরের চেষ্টা করে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি উচ্ছৃঙ্খল গ্রুপ। চাঁদা না দিলে তারা খামারে অগ্নিসংযোগ করার হুমকি দেয়। ১৫-২০টি মোটরসাইকেল ও দুটি মাইক্রোবাসে করে তারা সেখানে যায়। এই ঘটনায় দক্ষিণ সদর থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ভাড়ায় খাটে। এ ছাড়া সাইকেল চালানো, রাতে বাইরে থাকাসহ বেপরোয়া চলাফেরা করে থাকে।
পুলিশ সদরদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী বাদে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্রুপের সদস্য সংখ্যা দুই হাজার ৫৫০। ডিএমপির তথ্য বলছে, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ১৫৯টি গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপে সদস্য রয়েছে এক হাজার ৮১২। ঢাকার মধ্যে মোহাম্মদপুরে সর্বোচ্চ ২৭টি কিশোর গ্যাং আছে। এসব গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা অন্তত সাড়ে ৩০০। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬টি পল্লবী থানা এলাকায়। এসব গ্রুপে সদস্য সংখ্যা অন্তত ১৬০।
