October 8, 2026

উপকূলের পানিতে জীবাণু-আর্সেনিক, বৃষ্টির জলেও দূষণের আশঙ্কা

সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট দীর্ঘদিনের। লবণাক্ততা ও আর্সেনিকের পাশাপাশি নলকূপ, পুকুর এবং সংরক্ষিত বৃষ্টির পানিতেও জীবাণু ও ভারী ধাতুর দূষণের ঝুঁকি রয়েছে। ফলে শুধু পানি দেখতে পরিষ্কার হলেই তা নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তা নেই।

খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির মতো এলাকায় বহু পরিবার বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে মাসের পর মাস ব্যবহার করে। বাড়ির ছাদ থেকে পাইপের মাধ্যমে ট্যাংক বা ড্রামে পানি জমিয়ে রাখা হয়। তবে সঠিকভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ না করলে সেই পানিতেও জীবাণু ঢুকতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত পানির উৎসে ই-কোলাই পাওয়া গিয়েছে। ঘরে পান করার সময় পরীক্ষিত পানির ৯২.৯ শতাংশে এই জীবাণু পাওয়া যায়। একই জরিপে খুলনা বিভাগের ১৭.৮ শতাংশ মানুষের পানির উৎসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার বেশি আর্সেনিক পাওয়া গিয়েছে।

জরিপে আরও দেখা যায়, খুলনা বিভাগের মাত্র ১৮.২ শতাংশ মানুষ এমন পানির আওতায় রয়েছেন, যেখানে পানির উৎস উন্নত, প্রয়োজনের সময় পানি পাওয়া যায় এবং পানিতে ই-কোলাই ও অতিরিক্ত আর্সেনিক নেই। লবণাক্ততাও বড় সমস্যা। বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় পানির উৎসে মাঝারি ও উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা পাওয়া গিয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচ উপজেলা নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বছরে গড়ে প্রায় সাড়ে চার মাস নির্ভরযোগ্য পানির সংকট থাকে। পাইকগাছায় এই সময় সাত মাসের বেশি। মাত্র ১৬ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব পানির উৎস রয়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবারে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব নারী ও কিশোরীদের ওপর।

বৃষ্টির পানি এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হলেও সেটিও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। খুলনার দাকোপে ১১৬টি পরিবারের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে,  সংরক্ষিত বৃষ্টির পানির বিভিন্ন নমুনায় মলজাতীয় কলিফর্ম ও মোট কলিফর্মের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার ওপরে ছিল। কিছু নমুনায় সিসার উপস্থিতিও পাওয়া গিয়েছে।

গবেষকদের মতে, ছাদের ময়লা, পাখি বা প্রাণীর মল, প্রথম বৃষ্টির পানি সরিয়ে না ফেলা এবং অপরিষ্কার ট্যাংক থেকে জীবাণু পানিতে ঢুকতে পারে। পুরোনো পাইপ বা সংরক্ষণব্যবস্থার উপকরণ থেকেও ভারী ধাতু পানিতে মিশতে পারে।

পানির সংকটের প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যের ওপরও। স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, গরমের সময় উপকূলীয় এলাকায় পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ে। পাশাপাশি লবণাক্ত পানির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় এলাকায় শুধু পানির ব্যবস্থা করলেই হবে না, পানির মান নিয়মিত পরীক্ষা, সংরক্ষণব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপদ পানি ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণকে কার্যকর সমাধান করতে হলে সঠিক সংগ্রহ ও পরিশোধনব্যবস্থার দিকেও নজর দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *