August 18, 2026

ঢাকায় মাদক কারবারে চিহ্নিত ৪০৬, তাদের অর্থ-সম্পদের অনুসন্ধানে সিআইডি

ঢাকায় মাদক কারবারে ৪০৬ জনকে চিহ্নিত করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এরা দীর্ঘদিন ধরে মাদক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই ৪০৬ মাদক কারবারি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে একযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এ কার্যক্রম শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানি লন্ডারিং ইউনিট।

অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তাদের স্বজনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য খুঁজে বের করা হচ্ছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে পৃথকভাবে চারটি সংস্থাকে চিঠি দিয়েছে সিআইডি। একসঙ্গে মাদক-সংশ্লিষ্ট এত সংখ্যক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের ঘটনা এই প্রথম।

তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য পেতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) চিঠি দিয়েছে সিআইডি। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে চিঠি দিয়ে চাওয়া হয়েছে সম্পদের হিসাব। সংশ্লিষ্ট থানার ওসির কাছে লিখিত পত্র দিয়ে অভিযুক্তদের ব্যাপারে তথ্য দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযুক্তদের জাতীয় পরিচয়পত্র চাওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে।

সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন বলেন, অনেকের কাছে মাদক অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হওয়া যায়। সমাজে অনেক অপরাধের মূল কারণ মাদক।

তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের অবৈধ অর্থ ও সম্পত্তির উৎস সন্ধান করা এবং এ-সংক্রান্ত অর্থ পাচারের তদন্ত করা সিআইডি শিডিউলভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ বিষয়ে আমরা খুব সিরিয়াস। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে নতুন যে আইন হয়েছে, তাতে আশা করি, আরও কার্যকর ও শক্তভাবে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

সিআইডির যে অনুসন্ধান শুরু করেছে এদের সবার নেটওয়ার্ক ঢাকাকেন্দ্রিক। সবার বিরুদ্ধে অন্তত চারটি মামলা আছে। কারও কারও বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ২০ থেকে ৪৭। এ তালিকায় নারী মাদক ব্যবসায়ীও রয়েছেন। সিআইডির চিঠির জবাবে এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর ব্যাপারে ওসিদের পক্ষ থেকে তথ্য দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য এখন যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মামলা রয়েছে ভাটারার রাজু আহমেদের– ৪৭টি। এরপরই রয়েছে ভাসানটেকের মো. রূপচানের– ৪৩টি। এ ছাড়া শাহজাহানপুরের মো. সোহেলের বিরুদ্ধে মতিঝিল ও শাহজাহানপুর থানায় ২৭টি মামলা রয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে এসব মামলা হয়েছে। সোহেল বর্তমানে পলাতক। তিনি এলাকায় ‘কানা সোহেল’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া খিলগাঁওয়ের পূর্ব গোড়ানের বাসিন্দা মো. খালেদ মিয়ার বিরুদ্ধে ২১টি মামলা রয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে এসব মামলা হয়েছে। সর্বশেষ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এ বছরের ১১ মার্চ খিলগাঁও থানায়। এ ছাড়া খিলগাঁওয়ের ত্রিমোহনী এলাকার মাদক ব্যবসায়ী মাইন উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ১৪টি। গত আট বছরে তার বিরুদ্ধে এসব মামলা হয়েছে। সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে গত ৯ জানুয়ারি। রাজধানীর মুগদা এলাকার মাদক ব্যবসায়ী মো. লালনের বিরুদ্ধে মামলা আছে ২২টি। তার গ্রামের বাড়ি ভোলার ইলিশায়। বর্তমানে তিনি পলাতক। সর্বশেষ ৩ জুন পল্টন থানায় লালনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া সবুজবাগের উত্তর বাসাবোর বাসিন্দা মো. নুরুন্নবীর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের দাতপুরে। তিনি সবুজবাগে ‘টেস্টি বাবু’ হিসেবে পরিচিত। সবুজবাগের আরেক বড় মাদক ব্যবসায়ী হলেন মো. শামীম। রমনা, সবুজবাগ, ওয়ারী, মুগদা, খিলগাঁও থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা আছে ১৬টি। জামিন পেয়ে বর্তমানে পলাতক শামীম।

সিআইডির অনুসন্ধানের তালিকায় আরও রয়েছেন হাজারীবাগের মো. সুমন, আজগর আলী ও ফালান শিকদার। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ১০টির বেশি মামলা আছে। এ তালিকায় কামরাঙ্গীরচরের মনির হোসেন, খুরশিদা বেগম খুশি, সিদ্দিক মিয়া ও হাসির নাম আছে। সিদ্দিক মিয়ার বিরুদ্ধে ২৪টি মামলা আছে। খুরশিদা ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার বিরুদ্ধে নিউমার্কেট ও কামরাঙ্গীরচর থানায় ১৪টি মামলা রয়েছে।

কোতোয়ালি এলাকার মন্টি কুমার নাথ, সাইফুল ইসলাম সাগর, নূরে আলম, ইমরান, অসিত নন্দী, শম্ভুনাথ সুর ও জিতু চন্দ্র দাসের নাম আছে। শম্ভুনাথ সুরের বিরুদ্ধে মামলা আছে ২০টি। তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয়েছে কোতোয়ালি থানায় ২০১২ সালের ৩০ মে। এ হিসাবে তিনি ১৬ বছর ধরে মাদক ব্যবসায় জড়িত। শম্ভুর বিরুদ্ধে সর্বশেষ মামলা হয়েছে ২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর কোতোয়ালি থানায়। এ ছাড়া কোতোয়ালির অসিত নন্দীর বিরুদ্ধে মামলা আছে ১৯টি।

চকবাজারের তারা মিয়া ও মো. রতনের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। লালবাগ এলাকার মো. বাবুল, শাকিল ও মো. আসাদের নাম আছে। বংশালের বিল্লাল হোসেন শাওন, শ্যামপুরের দিনার কাজল, মো. শহিদ, মিরপুরের শাহ আলীবাগের মোছা. বকুলী, ভাটারার রুবেল মিয়া, রাজু আহমেদ, খিলক্ষেতের আক্তার হোসেন, বনানীর জিল্লুর রহমান, ভাসানটেকের মো. বাবুল, মোরশেদা বেগম, কাফরুলের মাহবুবুর রহমান, রূপনগরের সালেহা বেগম, বাড্ডার সাতারকুলের হোসনা আক্তার, মোহাম্মদপুরের ভুঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল, মনু ওরফে গলাকাটা মনু, মো. সারফু আরমান, আনোয়ার হোসেন কাল্লু, সেলিম, আরিফুল ইসলাম, শেরেবাংলা নগরের শুক্কুরের নাম আছে।

তালিকায় আরও রয়েছেন হাজারীবাগের মো. সুমন, নিপা আক্তার, লাকি, আবুল কালাম, মানিক, আসাদ মিয়া, সোনিয়া বেগম, মমিন মিয়া, আজগর আলী, আবদুস সামাদ, বশির, সালমা আক্তার, সজল, কামরাঙ্গীরচরের মনির হোসেন, আরমান, নওয়াব আলী, ইয়াকুব আলী, মোশাররফ হোসেন, টুটুল হোসেন, আবদুর রহমান, রহমত উল্লাহ, মন্টি কুমার নাগ, কোতোয়ালি এলাকার সাইফুল ইসলাম, পারুল রানী, মনির হোসেন, নূরে আলম, ইমরান, সুফিয়া বেগম, রানা কুমার নাগ, মাইনুদ্দিন, মো. আকরাম, মো. আজিম, মো. জীবন, সাজন প্রসাদ, চকবাজারের আরমান হোসেন, তারা মিয়া, মো. শাহিন, রেজাউল, লালবাগের মো. তুহিন, শাওন, স্বপন, রোজিনা আক্তার, মো. শাকিল, মো. মিজান, মামুন মিয়া, মো. আরিফ, মো. জুয়েল, হায়দার হোসেন, রোজিনা বেগম, হোসেন উদ্দিন ও মো. খলিল।

দেশে মাদকের ‘প্রবেশদ্বার’ হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার-চট্টগ্রাম। এ ছাড়া বিভিন্ন সীমান্ত হয়ে মাদক ঢুকছে। আবার পর্যটন এলাকা হিসেবে খ্যাত কক্সবাজার দীর্ঘদিন ধরে মাদকের প্রধান রুট। মিয়ানমার থেকেও প্রতিদিন ঢুকছে ইয়াবা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মাদক সেবন, ব্যবসা ও পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মাসে সারাদেশে মাদকদ্রব্য উদ্ধারজনিত মামলা হয়েছে ৬,৩৮৩টি। খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, নারী-শিশু নির্যাতন, অপহরণসহ সব ধরনের অপরাধে জুলাইয়ে মামলা হয়েছে ১৭,৯১১টি। এ হিসাবে জুলাই মাসের মোট মামলার ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ মাদক-সংক্রান্ত। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সারাদেশে সব ধরনের অপরাধের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৫ হাজার ৩৮৯টি। এর মধ্যে মাদক-সংক্রান্ত মামলা চার হাজার ৬৫৮টি। এ হিসাবে মোট মামলার ৩০ শতাংশ মাদক-সংক্রান্ত।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রায় তিন কোটি ৬১ লাখ ইয়াবা, ২৫০ কেজি হেরোইন, ২২ কেজি কোকেন, আট কেজি আফিম, ৮২ হাজার ২৭৫ কেজি গাঁজা এবং পাঁচ লাখ ৫১ হাজার ৭৮৮ বোতল ফেনসিডিল জব্দ করেছে সংস্থাটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *